For English Version
মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮
হোম অনলাইন স্পেশাল

টাকার অভাবে স্ত্রী-স্বামীর পরিচয় দিতে চায় না

Published : Thursday, 4 January, 2018 at 6:02 PM Count : 166

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় বেতন না থাকায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে গেছে। টাকার অভাবে স্ত্রী, স্বামী বলে পরিচয় দিতে চায় না। স্বামী হিসেবে কোনো দায়িত্বই পালন করতে পারি না। কোন সখ আহ্লাদ পূরণ করতে পারি না। কত ঈদ যায়, চাঁদ যায়, বিভিন্ন উৎসব যায় কিন্তু অন্যান্য চাকুরীজীবীর মত তাদেরকে সুযোগ সুবিধা দিতে পারি না, এর চেয়ে লজ্জার আর কি হতে পারে।' অনেকটা ক্ষোভ নিয়েই কথাগুলো বলছিলেন নাঁওগা জেলার বদলগাছী থানার পিটিএম বহুমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জাহিদুর রহমান।

শুধু জাহিদুর রহমানই নয়, আরো ৫ হাজার জাতি গড়ার কারিগরেরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দীর্ঘ ৫ দিন থেকে আমরণ অনশন করছে।  

গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে নন-এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। প্রথমে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলেও সরকার কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে ৩১ ডিসেম্বর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করে। অনশন করায় ৫ম দিনে ৬৭ জনের মতো শিক্ষক ও কর্মচারী অসুস্থ হয়েছেন। আজও ১৫ জনের মতো শিক্ষক অসুস্থ হলে হাসপাতাল নেয়া হয়।

বাবা হয়ে সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে না পারা বাবার আকুতি ভরা কন্ঠে শিক্ষক জাহিদুর জানান, 'আমার তিনটা ছেলে ও একটা মেয়েসহ ছয় জনের সংসার। বাচ্চা দু-পাঁচ টাকা চায়, কিন্তু দিতে পারি না। বাচ্চাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ না করতে পারায় মাঝে মধ্যে সন্তান এবং স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়তে হয়।

চাকুরী পাবার সময় অনেক আশা নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসি। ভেবেছিলাম, জাতি গড়ার কারিগর হবো। হয়েছিও তবে বেতন না পেয়ে আজ অসহায়। টাকা নেই, অনেক সময় খাবারও থাকে না। সংসারের কত সমস্যা তা কর্তা হিসেবে সমাধানও করতে পারি না। নিজের সমস্যাই সমাধান করতে পারি না শিক্ষক হয়ে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা সমাধানে মনযোগ দিবো কিভাবে?  ১১ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। আমি যে পদে চাকরী করি, তাতে ২৩ হাজার টাকা বেতন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এগারো বছরে ২৩ টাকাও পাই নি। বাড়িতে দুই-একটা গাভী আছে, যা দিয়ে ডাল-ভাত খেয়ে কোন রকমে আল্লাহ পাক চালিয়ে নেয়।

যে শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। যার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ পরিচালনা করবে। সেই শিক্ষকই জীবন চালানোর জন্য পরের দোকানে খন্ডকালিন কাজ করে। আজ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে কোনো দিকে না তাকিয়ে রাজপথে না খেয়ে আমরণ অনশনের আশ্রয় নিয়েছে শিক্ষকেরা। 

কৌতহলবসত জানতে চাইলাম, অনশন অবস্থায় কিছু খেয়েছেন কি না? উত্তর পেতে তেমন দেরি হয়নি। বলেন, না। আমি এই কয়দিন কিছুই খাইনি। অসুস্থ হয়ে গেলে শুধুমাত্র স্যালাইন দিয়েছি।

শিক্ষকদের রাস্তায় কনকনে শীতের মধ্যে অবস্থান অসহনীয়। তবে সরকারের নির্দেশ এবং আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত এমনভাবেই থাকবেন তারা। বলেন, এমপিও করার নির্দিষ্ট সময় না দিলে আমরা এ স্থান ছেড়ে যাবো না। আমরা কনকনে শীতের মধ্যে রাস্তায় কষ্টে করে দিনতিপাত করছি। এটা দেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সদয় হবেন এবং এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করবেন বলে আশা করছি

যারা ১৫ থেকে ২০ বছর বিনা বেতনে শিক্ষাদান করছেন তাদের অনেককেই পারিবারিক-সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে। 

বরিশালে শহীদ জামিলা খাতুন মহিলা কলেজ শিক্ষিকা সুহানা নাসরিন। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পড়াশুনার জীবন শেষ করে শিক্ষকতা পেশা বেঁছে নেন তিনি। কিন্তু শিক্ষকতা তাকে স্বাবলম্বী করতে পারেনি। বলেন, আমার পরিবার আমাকে শিক্ষিত করেছে। সবাই আশা করে আমি ফ্যামিলিকে সাপোর্ট করবো। কিন্তু আমরা নিরুপায়। যে রিকশা চালায়, সেও কিন্তু কিছু পায়। ২০১০ সাল থেকে চাকরী করছি, একটা টাকাও পাইনি, বরং আমরা স্বামীর উপর নির্ভরশীল হয়ে আছি। শিক্ষিত হয়ে যদি অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। তাহলে শিক্ষিত হয়ে লাভ কি?

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি ঘরে ঘরে চাকরী দিবেন। আমরা যেহেতু চাকরী করি, তাই আশা করছি প্রধানমন্ত্রী আমাদের এমপিওভুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

দুই বছর যাবাৎ বাগেরহাট নুরজাহান মহিলা কলেজের বাংলা প্রভাষক পদে কর্মরত রয়েছেন রাজিয়া সুলতানা। চাকুরি পাবার পরেও বেতন না পাওয়ায় পরিবারের কথা যে তিক্ত হয় তার উদারহণ দিয়ে তিনি বলেন, ' যখন একজন মাস্টার্স করে তখন সে নিজের উপর নির্ভরশীল হয়। কিন্তু আমাদেরকে অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হচ্ছে। যার কারণে পরিবারের মানুষের কথা শুনতে হয়।'

ক্লাস না করে আন্দোলন করায় ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষতি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ ক্ষতি তো হচ্ছেই। এজন্য আমরা অনুতপ্ত। কিন্ত আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। পেটে ক্ষুধা রেখে তো মুখে ঈশ্বরের নাম নেওয়া যায় না।'

অনেকটা মনের কষ্ট থেকেই রাজিয়া সুলতানা বলেন, সরকারের যদি এমপিওভুক্ত করার ইচ্ছা না থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিক। তা না করে আমাদের সঙ্গে এ ধরণের প্রহসন কেন করছে? 

আবারো স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে চান শিক্ষিকা নুরজাহান। বলেন, আমরা চাচ্ছি সরকার আমাদেরকে মর্যাদা দিয়ে বেতন দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবে।

এইচএস








« PreviousNext »



সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000. Phone :9586651-58. Fax: 9586659-60, Advertisement: 9513663
E-mail: info@dailyobserverbd.com, news@dailyobserverbd.com, advertisement@dailyobserverbd.com,   [ABOUT US]     [CONTACT US]   [AD RATE]   Developed & Maintenance by i2soft